শতরঞ্জি এর ইতিহাস

শতরঞ্জি

শতরঞ্জি সম্পর্কে কিছু অজানা তথ্য

শতরঞ্জির আদি ইতিহাস সঠিকভাবে বলা বর্তমান প্রজন্মের পক্ষে সম্ভব না । ধারণা করা হয় যে মুসলিম শাড়ি ও শতরঞ্জি একই সময় তৈরী হয় এবং সারা বিশ্বে এটি ছড়িয়ে পরে ।

কালের বিবর্তনে এটি হারিয়ে যায় ,পরবর্তিতে ইংরেজদের আমলে শতরঞ্জি আবারো জনপ্রিয় হয়ে উঠে এবং ধীরে ধীরে চলতে থাকে এর উৎপাদন ।

আমাদের প্রত্যেকের বাসায় শতরঞ্জি জিনিসটা আছে । শতরঞ্জি হল এক প্রকার মোটা কাপড়। যা ঘরের মেঝেতে, টেবিল ক্লথে, জায়নামাজ, পাপোশ তৈরিতে ব্যাবহার করা হয়।

রংপুর জেলায় তৈরি এই শতরঞ্জি অনেক বিখ্যাত। অনেক প্রাচীন আমল থেকেই শতরঞ্জি তৈরি করছে রংপুরের কৃষকরা।

আজকে আমি আপনাদের জানাবো রংপুর জেলার ঐতিহ্যবাহি শতরঞ্জির ইতিহাস নিয়ে  —

শতরঞ্জি

রংপুরের শতরঞ্জি হল এক ধরনের কার্পেট।শব্দটি ফারসি শতরঞ্জ থেকে এসেছে। শতরঞ্জ হলো দাবা খেলার ছক।

দাবা খেলার ছকের সঙ্গে শতরঞ্জির নকশার মিল আছে। সেখান থেকেই নামটি এসেছে। এটি জেলার ঐতিহ্যবাহী বুননশিল্প।

এটি অনেক আগে অভিজাত বাড়ির বৈঠকখানায় বা বাংলো বাড়িতে ব্যাবহার করা হত।

একথা অনেকেই জানেন, মোগল সম্রাট আকবরের দরবারে শতরঞ্জি ব্যবহার করা হতো।

একসময় রাজা-বাদশাহদের কাছেও এর কদর ছিল।জমিদারদের ভোজনের আসনেও এর ব্যবহার ছিল।

এই শতরঞ্জি নদীপথে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে যেত। সময় বয়ে গেছে।

একসময় রংপুর থেকে এই বুননশিল্প প্রায় হারিয়ে গিয়েছিল। এখন আবার জেগে উঠছে এই শিল্প।

ত্রয়োদশ শতাব্দীতে রংপুরের নিসবেতগঞ্জ এলাকায় (আদি নাম পীরপুর) এই শতরঞ্জি বুননের কাজ শুরু হয়।

বর্তমান বিশ্বে শতরঞ্জি প্রাচীনতম বুননশিল্পের একটি। হস্তজাত এ পণ্য তৈরিতে কোনো যন্ত্র ব্যবহার করা হয় না। বাঁশ ও রশি দিয়ে টানা দেওয়া হয়।

পাটের তৈরি সুতো দিয়ে সম্পূর্ণ হাতে নকশাখচিত শতরঞ্জি তৈরি করা হয়। কোনো রকম জোড়া ছাড়া যেকোনো মাপের শতরঞ্জি তৈরি করা যায়।

বর্তমান বিশ্বে বুনন শিল্পের মধ্যে ‘‘শতরঞ্জি বুনন’’ সবচেয়ে প্রাচীনতম।

মজার ব্যাপার হলো, এ পণ্য উৎপাদনে কোন প্রকার যান্ত্রিক ব্যবহার নেই।

কেবলমাত্র বাঁশ এবং রশি দিয়ে মাটির উপর সুতো দিয়ে টানা প্রস্ত্তত করে প্রতিটি সুতা গননা করে হাত দিয়ে নকশা করে শতরঞ্জি তৈরী করা হয়।

কোন জোড়া ছাড়া যে কোন মাপের শতরঞ্জি তৈরী করা যায়। এর সৌন্দর্য্য ও টেকসই উল্লেখ করার মত।

১৯৭৬ সালে সরকারীভাবে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প কর্পোরেশন (বিসিক) নিসবেতগঞ্জ গ্রামে শতরঞ্জি তৈরীর একটি প্রকল্প গ্রহণ করে।

কিন্তু ব্যাপক বাজার সৃষ্টি করতে না পারায় ধীরে ধীরে প্রকল্পটি মুখ থুবরে পড়ে।

আশার কথা হলো যে, ১৯৯৪ সালে একটি বে-সরকারী উন্নয়ন সংস্থা বিনা পয়সায় আরও উন্নত প্রশিক্ষণ দিয়ে

ঐ এলাকার মানুষদের শতরঞ্জি উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করতে থাকে।

সেই থেকে আর থেমে নেই শতরঞ্জির উৎপাদন। এখন নিসবেতগঞ্জের প্রায় বাড়িতেই শোনা যায় শতরঞ্জি উৎপাদনের ঘটাং ঘটাং শব্দ ।

বর্তমান সভ্যতায় কারুশিল্পের প্রতি মানুষের আকর্ষণ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে যা শতরঞ্জির জন্য অত্যন্ত শুভ ।

বর্তমানে রংপুরের শতরঞ্জি ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার প্রায় ৩৬টি দেশে রপ্তানী হচ্ছে ।

এমনকি বাংলাদেশেও রংপুরের শতরঞ্জির ব্যাপক চাহিদা ।

বর্তমানে কারুপণ্য রংপুর লিমিটেড নামক একটি বে-সরকারি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে শতরঞ্জি তৈরীর পাঁচটি কারখানা ।

বর্তমানে এসব কারখানায় প্রায় চার হাজার শ্রমিক কাজ করছে ।

এক পরিসংখ্যানে প্রাপ্ত তথ্য মতে বর্তমানে বাংলাদেশে রপ্তানী বাণিজ্যে হস্তশিল্পের ৬০ শতাংশই রপ্তানী হয়ে থাকে রংপুরের শতরঞ্জি।

বিগত তিন বছরে গড়ে প্রতিবছর প্রায় ৪০ লাখ ডলার দেশে আনা সম্ভব হয়েছে এই রংপুরের উৎপাদিত শতরঞ্জির মাধ্যমে।

ব্রিটিশ শাসনামলে এটি এত বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করে যে, এখানকার তৈরি শতরঞ্জি ভারতবর্ষ,

মিয়ানমার, সিংহল, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি হতো।

প্রতি বছর ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যে পরিমাণ কারুশিল্প সামগ্রী রফতানি হয়, তার ৫০ ভাগই শতরঞ্জি।

রফতানি হচ্ছে বিশ্বের ৩৬ দেশে। বছরে আয় হচ্ছে প্রায় ৪০ লাখ মার্কিন ডলার।

১৯৭৬ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি আবু সাদত মোহাম্মদ সায়েমের নির্দেশে প্রথম সরকারিভাবে

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশনের (বিসিক) মাধ্যমে নিসবেতগঞ্জ গ্রামে শতরঞ্জি তৈরির প্রকল্প গ্রহণ করে।

এই ধারাবাহিকতায় ১৯৮৫ সালে প্রথম সরকারিভাবে বিসিক শতরঞ্জি শিল্পে জড়িত ৪৫ জন শ্রমিককে কারিগরি শিক্ষা দেওয়া হয়।

এরপর থেকে অবধি অবহেলিত শতরঞ্জি শিল্পটি সরকারের দৃষ্টিতে আসেনি।

বিসিকের উদ্যোগে এই শিল্পের প্রাতিষ্ঠানিক যাত্রা হলেও পরবর্তীতে ঢাকার এক ব্যবসায়ী বিসিকের এই কেন্দ্রটি লিজ নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু করেন।

পরবর্তী সময়ে রংপুর শহরের কারুপণ্যের মালিক শফিকুল আলম সেলিমের আন্তরিক প্রচেষ্টায় শতরঞ্জির ব্যবহার আরো বহুমুখী হয়ে ওঠে।

তবে কয়েক বছর আগে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার মধ্য দিয়ে খ্যাতিসম্পন্ন ফ্যাশন ডিজাইনার বিবি রাসেলের উদ্যোগে ইউরোপীয়

কমিশনের মাধ্যমে ইউরোপের বাজারে রংপুরের শতরঞ্জির পুনঃপরিচয় ঘটে।

ইতিবাচক সহযোগিতা পেলে এই নান্দনিক শিল্পটি বাংলাদেশের অর্থনীতিসহ নানামুখী সহযোগিতা এবং বেকারত্ব সরানোর কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

শতরঞ্জি পণ্যটির সৌন্দর্য্য বহুমুখী ব্যবহার, পরিবেশ বান্ধব  ও সাশ্রয়ী মূল্য হওয়ায় সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে ধনী মানুষদের আকর্ষণীয় পণ্য হিসেবে লাভ করায় দেশ ও বিদেশে প্রচুর চাহিদা তৈরী করে ।

আমাদের সম্পূর্ণ প্রোগ্রামটি দেখার জন্য নিচের লিংক এ ক্লিক করুন :


 

 

2 Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Click to access the login or register cheese

Shop By Department